চরিত্র
|
সংলাপ/স্থুলশরীর
|
অনুচ্চারিত অন্তর্লোক
|
মা
|
আমাদের চেনাশোনা, ভালোবাসা হবার আগেই মা যখন মারা গেলেন তখন তাঁর বয়স উনিশ বছর, আর আমরা দশ মাস। মায়ের এই অসমাপ্ত জীবন বা আমার জীবন থেকে তাঁর এই চিরঅপসারণ একটা প্রাকৃতিক ঘটনামাত্র।
|
শোক যেন এখানে “জীবনের সব চেয়ে অর্থময় ছবি”। শরীরের অপূর্ণতা, ব্যর্থতা পেরিয়ে কনভেনশন পেরিয়ে সে যেন নিজেকে শনাক্ত করতে পারার এক আলোকিত সত্য। শরীরের বহিরাবরণ থেকে সান্নিধ্য ও সংযোগ থেকে অনিলম অমৃতম অর্থাৎ দেহ গেহ হতে স্থির অকম্প এক নিভৃত ন্যারেটিভ। বরিশালের গৈলা গ্রামে মণীন্দ্র গুপ্তের জন্ম, স্কুলজীবন বরাক নদীর তীরে শিলচরে আর কলেজপর্ব কলকাতায় আর তারপর লাহোর বা উত্তরপশ্চিমের সীমান্তের কয়েক জায়গায় চাকরিতে যোগ-মোটামুটি এতটুকুই ‘অক্ষয় মালবেরির’ জাগরূক শরীর। কিন্তু তাঁর বীজ ও অবয়ব? সে আসলে এক আরণ্যক মানুষের কোটরের দরজা খুলে প্রাণ পণে দৌড়ে যাওয়া বিশাল মহীরূহের দিকে। মনোময় ক্ষুদ্র সীমাবদ্ধ ‘আমি’ থেকে এক অকর্ষিত ‘আমি’র দিকেই তাঁর আত্মকৌতুক। মৃত্যু তাঁর কাছে জীবিত যেভাবে জীবন তাঁর কাছে জীবিত; অন্ধকার ছাড়া আলো যেভাবে এবং অবয়বস্বরূপ ছাড়া যেভাবে আত্মার দর্শন সম্ভব নয় ঠিক সেভাবেই ‘অক্ষয় মালবেরি'র ছত্রে ছত্রে আমরা খুঁজে পাই এক আদিত্যমন্ডলস্থ পুরুষ, যিনি প্রাণবায়ু খুঁজে চলেছেন, ঢের গভীরের দৃশ্য দেখে চলেছেন যিনি। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে মণীন্দ্র গুপ্ত আর তাঁর চরিত্ররা কোথাও যেন নির্বিকার, বিরাট আকারের এক থাকার মাঝে একটা দোলা দেওয়া নৌকা থেকে একটা নৈর্ব্যক্তিক নিবেশতা থেকে বারবার যারা তলিয়ে যেতে দেখছে এক জড়বিদ্যালয় এক কারুবাসনা। দেখা যায় না যার এপার ওপার এমন এক অবস্থান থেকে মণীন্দ্র গুপ্তও দেখে চলেছেন- “জনমানবহীন দ্বীপের বালির উপর দিয়ে চাঁদের আলোয়/নৌকা ভেসে যায়” ……
|
ছোড়দাদুর মা
|
বাড়ির শ্মশানের দোলমঞ্চের পাশে তাঁকে চিতায় শুইয়ে আগুন দেওয়া হল। হরি-ই-বলো, হরি-ই-বলো, হরি হরি বলো বলে সবাই উচ্চৈঃস্বরে যেমনি ধ্বনি দিচ্ছে,আগুনও তেমনি লাফিয়ে লাফিয়ে উপরে উঠছে। কোথায় শোক ? বেশ একটা কাজ চলছে যেন-একজনের দীর্ঘ জীবনের চিরকালের মত কাজ।
| |
কাকা
|
কাকা সত্যিই পদ্মপাতায় জল- যতক্ষণ টলটল করে ততক্ষণ ভারি সুন্দর। একদিন সে সত্যি সত্যিই পদ্মপাতায় জলের মত চলে গেল।
| |
দাদু
|
…আমি হাত বুলিয়ে বুলিয়ে তাঁকে স্নান করালাম। নতুন কাপড় পরিয়ে তাঁকে চিতায় শোয়ানো হল। আমি জ্বলন্ত একগোছা পাটকাঠি তাঁর মুখে ধরলাম, চড়াৎ করে দাড়িগোঁফে আগুন লেগে গেল। সবাই উচ্চৈস্বরে হরিধ্বনি দিয়ে চিতা ধরিয়ে দিল। আমার আর কিছু করনীয় নেই…মুখ ফিরিয়ে দেখলাম পুকুরের ওপারে এসে ছোটমারা দাঁড়িয়ে আছে-মনে হল, পুড়তে থাকা দাদু সমেত আমরাই জীবিতে দলে- ওরা, ঐ ওপারে সারি বেঁধে দাঁড়ানো মেয়েরা পরলোকের মানুষ, দুখঃময় তাদের ময়লা চেহারা। এপারে কত আগুন, ঐপারে অন্ধকার, ছায়া ।
| |
ঠাকুমা
|
ঠাকুমাকে তুলে মন্ডপে শুইয়ে দিয়ে কাকারা আম গাছ কাটতে গেল, যাবার সময় আমাকে বলে গেল ঠাকুমাকে ছুঁয়ে বসে থাকতে, পিসিমাদের অনেক কাজ, তারা বাড়িতে ছুটোছুটি করছে। আমি একা ঠাকুমাকে দেখছি-আদুড় বুকের হালকা স্তন দু দিকে নেতিয়ে পড়েছে, টিপে টিপে দেখছি শরীর শক্ত হয়ে যাচ্ছে। হাত আর ভাঁজ করা যায় না। ঠোঁটে কোনায় চার –পাঁচটা পিঁপড়ে লেগেছে। লাইন দিয়ে আসছে আরো পিঁপড়ে। আমি এক হাতে তাঁকে ছুঁয়ে আরেক হাতে পিঁপড়ে মারতে লাগলাম।
|
চরিত্র
|
ফিজিকাল/রিয়েল ইম্প্রেশন
|
মেন্টাল ইম্প্রেশন
|
কুঞ্জদিদি
|
‘চিঠি নিয়ে দুটো ঋতু চলে গেল। কিন্তু কুঞ্জদিদির স্বামী এল না…… সারসীর মতো কুৎসিত পা, উঁচু কপাল, রোগা লম্বা গলা, তেমনি থমকে থমকে চলা- তাকে লোকালয়ের চেয়ে নদীতীরেই বেশি মানায়। ক্রমশ সে আর মানুষের চোখে পড়ে না।
|
“স্বামী ফিরে আসবে”। দাদা বৌদির আশ্রয়ে আশ্রিতা এক নারী যার একমাত্র স্বপ্নের রসদ তার স্বামীর প্রত্যাবর্তণের অপেক্ষা। কথককে দিয়ে বারংবার চিঠি লিখিয়েছে সে, আঁচলে লুকিয়ে রেখেছে একমাত্র স্বপ্ন হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে।
|
কার্তিক কাকার বউ
|
যুক্তি বুদ্ধির বাইরে এক সরল গ্রাম্যবধূ, ছোট্ট ছিপছিপে কালোসবুজ এক চরিত্র যার কাছে সত্য বলতে তার শহুরে স্বামী তার অন্দর তার সাবেকি সাংসারিক স্বতঃস্ফূর্তি ….
|
অথচ বাস্তবে শহরের স্বামীর দেওয়া সিফিলিসের শিকার তিনি। তার জীবন ক্রমশ পাঁশুটে, ধূসর লাল। গোপনীয়তার জন্য তার আশ্রয় সংসার না হয়ে ছায়ায় ভরা গভীর বন হয়ে ওঠে। শরীর পিষে নেওয়া এক আঠালো যন্ত্রণার মাঝে তার খসখসে উরু চুলকোয় এক তৃষ্ণার্ত স্বপ্ন ;
|
কার্ণিভালের খেলোয়াড় মিঃ পি সি পাল
|
দুঃসাহসিক এক খেলোয়াড়। আশি ফুট ওপর থেকে যিনি গায়ে আগুন লাগিয়ে ঝাঁপ মেরে দর্শককে তাক লাগিয়ে দিতেন। তাঁর গুরুত্বহীন স্মৃতিছবিগুলোতে আলো ফেললেই বোঝা যায় ভয়কে হারিয়ে দেওয়ার, সমাজকে হারিয়ে দেওয়ার, মামুলি মৃত্যুকে হারিয়ে দেওয়ার আগ্রাসী চেতনা দিয়ে তিনি শরীরের ছবি এঁকেছেন, যেন এক অন্যজগতের মানুষ , জীবনই যার কাছে একমাত্র ঝুঁকি। হু হু শীতের বাতাসে জ্বলন্ত মশাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাই যার কাছে অন্ধকারকে হারিয়ে দেওয়ার একমাত্র আখ্যান।
|
মাস তিনেক পরে খবর পাওয়া গেল কোথায় যেন খেলা দেখাতে গিয়ে পি সি পাল লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে চৌবাচ্চার কিনারায় পড়ে দু আধখানা হয়ে গেছেন। অথচ জীবনের জন্য কাকেই বা তিনি দায়ী করবেন! স্মৃতির বাইরে এই তার সহজাত ডায়ানাস্টি যেখানে মৃত্যু থেকে নিষ্কৃতি নেই, নিষ্কৃতি নেই যাপনের অনিবার্য যন্ত্রণা থেকে। ইনফিনিট ফ্রিডমের বাইরে আসলে মরজগতের কষ্ট যন্ত্রণা আর মৃত্যুতেই সে মহিমান্বিত। সমস্ত কার্নিভালে এ যেন এক একক মানুষের উদ্বৃত্ত খোলামকুচি …
|
বৈষ্ণবীদিদি
|
বিধবা মানুষ, মধ্যবয়সিনী, সংসারে কেউ নেই, কেবল সন্তানের মত কোলে করে আনতেন কাঠের গৌরাঙ্গ, রাসপূর্ণিমায় গেয়ে গেয়ে শোনাতেন দুঃখসুখ শূন্য এক ছায়াবৎ জগতের কথা ; এক নিটোল ঈশ্বরচেতনার কাছে তিনি যেন অসাড় থাকার অভ্যেস করছেন, উপকরণহীন থাকার অভ্যেস করছেন।
|
কিন্তু কি সে জগৎ ? ঈশ্বরের অধিকারের কাছে এসে সে কি অস্তিত্ববাদী মানুষের বিফল নিবেদন নয় ? প্রৌঢ়দিনের সাদা শাড়ি পরিহিতা এই নিবৃত্তরজস্কা মহিলাকে ঘিরে ঘিরে যে সাদা কুয়াশা, তার চারপাশে কেবল এক বেঁচে থাকার স্বপ্নচক্র, চোখ বুঝে আসা সর্বত্র পরম শূন্য।
|
ম্যাজিশিয়নের বউ
|
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণেই দেখা যাবে এ জাতীয় চরিত্রের সাথে সবসময়ই দু একটা সাদা কালো কনট্রাস্ট জড়িয়ে রয়েছে। জীবনের লৌকিকে দাঁড়িয়ে প্রাত্যহিক ধূপশহরে দাঁড়িয়েও যেন একটু জিরিয়ে নেওয়া, রিয়ালিস্ট জাদুর অগাধ ছায়ার নিচে স্বপ্নের কিছু অলক্ষ্য হিজিবিজি দাগ কাটা। সবকিছুই এক ঝলমলে অপ্রমাণ অথচ চিৎকারকে স্তিমিত করে জাদুকর বা তার বউ যেন রোদাক্রান্ত যাপনেও পরিতৃপ্তি খুঁজছেন, খুঁজছেন ধারাবাহিক জোনাকির প্রলাপ।
|
কেবল এক ইচ্ছাপূরণের অলীক প্রত্যাশা, দু চামড়ার মধ্যে নেতিয়ে থাকা শীতকে যেন বারবার রক্তশূন্য হাততালির মাঝে ঘুম পাড়িয়ে রাখা। পৃথিবীর মত এক অস্থায়ী মঞ্চে ম্যাজিশিয়নের বউ তার যাপনের জন্য ছাগলের কাটা জিভও যে অতিকষ্টে গিলে ফেলছেন তা যেন বারবার মনে করায় উপরের হাসির তলায় লুকিয়ে রাখা প্রয়োজনভিত্তিক এক বেঁচে থাকা। যেন পথে পথে ছড়ানো অন্ধকার আর নিজেরই অন্ধকারে ভিজিয়ে রাখা জীবনের জলপাই রঙের পাথরগুলো।
|
Uploaded By: : iPatrika Crawler
Views : ১ times
Published On : ২২-০১-২০২৩
Article Type : Article
Rating :